মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে লাগাম পড়তেই বড়দিনের মজুদে তোড়জোড়

মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত ৯০ দিনের জন্য স্থগিত হয়েছে।

মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত ৯০ দিনের জন্য স্থগিত হয়েছে। এ সময়ের জন্য দুই পক্ষই শুল্ক কমিয়েছে ১০০ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি, যার সুফল লুফে নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ সামনে বিক্রির প্রধান দুই মৌসুম ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও বড়দিন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ উপলক্ষে আগাম মজুদের দিকে মনোযোগ দেয়ায় হঠাৎ সমুদ্রবন্দর ও শিপিং কোম্পানির ওপর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। অথচ কয়েকদিন আগেও বন্দর ও পণ্যবাহী জাহাজগুলো অলস সময় পার করেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জাহাজে পণ্য পরিবহনের ব্যয় ও সময় দুটোই বেড়ে যাওয়া এবং এর প্রভাবে পণ্যমূল্যে হুইপস ইফেক্ট (পণ্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী বা নিম্নমুখী প্রবণতা থেকে আকস্মিকভাবে ব্যাপক মাত্রায় বিপরীতমুখী হয়ে ওঠাকে হুইপস বা হুইপ-স ইফেক্ট বলে। কভিড মহামারীর সময় বৈশ্বিক পণ্য পরিবহনে ব্যাঘাত ও ভোক্তাদের মজুদ প্রবণতার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল) তৈরির আশঙ্কা করছেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। খবর এফটি।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২ এপ্রিলকে ‘লিবারেশন ডে’ ঘোষণা দিয়ে ওইদিন বেশির ভাগ দেশের ওপর বড় অংকে শুল্ক চাপিয়ে দেন। এরপর চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে কনটেইনার বুকিং হঠাৎ কমে যায়। এখন আবার সে ধারার বিপরীতে দ্রুত আমদানি বাড়বে, যা বন্দর ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ তৈরি করবে বলে মত বিশ্লেষকদের।

পরামর্শক সংস্থা ভেসপুচি মেরিটাইম কনসালট্যান্সির প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন বলেন, ‘প্রথমে আমরা মার্কিন বন্দরগুলোয় পণ্য পরিবহনে ব্যাপক হ্রাস দেখতে পাব; এরপর চীন উপকূল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানোর ব্যাপক বৃদ্ধি দেখব। কভিড-মহামারীর সময় আমরা যে হুইপস ইফেক্ট দেখেছি, এটি তার একটি হুবহু প্রতিরূপ।’

লজিস্টিকস পরিষেবাদাতা কোম্পানি ফ্রেইটস আশঙ্কা করছে, হঠাৎ করে বাড়তি পণ্য পরিবহনের ফলে শিপিং লাইন ও বন্দরে টাইট ক্যাপাসিটি বা ধারণক্ষমতার ঘাটতি এবং পণ্য খালাসে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

বাণিজ্যযুদ্ধে বিরতির ফলে ৯০ দিনের জন্য চীনা পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ১৪৫ থেকে কমে ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। এ সময়ের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা চলমান থাকবে বলেও জানানো হয়েছে।

সাধারণত জুলাই থেকে মধ্য অক্টোবর নাগাদ চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্ল্যাক ফ্রাইডে ও বড়দিনের পণ্য রফতানি হয়। এটিই হলো মার্কিন আমদানির শীর্ষ মৌসুম। কিন্তু ১০ আগস্ট শুল্কযুদ্ধের মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কায় খুচরা বিক্রেতারা এবার আগেই অর্ডার দিচ্ছেন।

ফ্রেইটসের গবেষণা প্রধান জুদাহ লেভিন এক নোটে জানান, আগাম মজুদের কারণে ব্যবসায়ীরা কনটেইনার ভাড়ার উচ্চহার ও পণ্য পেতে কিছু বিলম্বের মুখোমুখি হতে পারে, যা কিনা পণ্যের উৎস চীন ও গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র উভয় ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক কমায় চীন-মার্কিন আমদানি-রফতানিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তার সম্পূর্ণ তথ্য পেতে কিছুটা সময় লাগবে। কারণ চীন থেকে পণ্যবাহী জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছতে চার-ছয় সপ্তাহ সময় নেয়। অর্থাৎ আরো কয়েক সপ্তাহ মার্কিন বন্দরগুলোয় চাপ কম থাকবে।

শিপিং তথ্য বিশ্লেষক সংস্থা সি-ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, শুল্কযুদ্ধের কারণে গত মাসে প্রায় চার লাখ কনটেইনার বুকিং বাতিল হয়েছে। ৫ মে থেকে পরের চার সপ্তাহের জন্যও এশিয়া থেকে উত্তর আমেরিকাগামী রুটে পূর্বপরিকল্পনার তুলনায় অনেক কম পণ্য বুকিং হয়েছিল। চীন-মার্কিন চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশন পূর্বাভাসে জানিয়েছিল, জুন-সেপ্টেম্বরের মধ্যে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কনটেইনার শিপমেন্ট ২০ শতাংশ কমতে পারে।

বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন অতিরিক্ত বুকিংয়ের চাপে কনটেইনার ভাড়া বাড়তে পারে। তবে ফ্রেইটস বলছে এ হার এখনো গত বছরের আমদানির মৌসুমের তুলনায় কম থাকবে। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলে প্রতি ৪০ ফুট কনটেইনার পরিবহনে ৮ হাজার ডলার এবং পূর্ব উপকূলে ৯ হাজার ৮০০ ডলারের বেশি লেগেছিল। এবার ভাড়া কম বাড়ার কারণ হতে পারে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরুর আগেই বড় শিপিং কোম্পানিগুলো বিপুলসংখ্যক নতুন কনটেইনার জাহাজের ক্রয়াদেশ দিয়েছিল, যা প্রতিযোগিতা আগের বছরের তুলনায় সীমিত করবে। ফ্রেইটসের জুদাহ লেভিন বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় ভাড়া এরই মধ্যে কমেছে ৩০ শতাংশ।’

তবে সি-ইন্টেলিজেন্সের প্রধান নির্বাহী অ্যালান মারফির মতে, ৯০ দিনের এ বিরতির পূর্ণ প্রভাব আগাম বলা কঠিন। কারণ চীনা পণ্যে এখনো আগের তুলনায় ৩০ শতাংশ শুল্ক বিদ্যমান।

তিনি আরো বলেন, ‘স্বাভাবিক অবস্থায় শুল্ক আরোপের আশঙ্কা থাকলে আমদানিকারকরা আগেভাগেই পণ্য পাঠাতে চান। কিন্তু এবার বাণিজ্যযুদ্ধের বিরতির মধ্যে ৩০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। তাই আগাম পণ্য পাঠানোর উৎসাহ কমে যেতে পারে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচার থেকে শুল্কের ওপর জোর দিয়ে আসছিলেন। এ কারণে তার বিজয়ের পর শুল্ক এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনে মজুদ করা যায় এমন পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। বিষয়টি সামনে রেখে কিছু বিশ্লেষক বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পর নভেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মজুদের উচ্চ হার উৎসবকেন্দ্রিক আমদানির চাপ কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। ন্যাশনাল রিটেইল ফেডারেশনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে গত এপ্রিল পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি ছিল।

মার্কিন সৌন্দর্য পণ্য ব্র্যান্ড রেভল্যুশন বিউটি মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা এপ্রিলের আগেই চীন থেকে উৎপাদিত বিপুল পণ্য মজুদ করে রেখেছিল, এখন যার সুফল পাচ্ছে। তাই শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন চালান অনুমোদন করছে।

আরও